Category: Blog

Blog

নীতিপুলিশগিরি ও দেশপ্রেম!

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় ঢুঁ মারলেই দেখা যায় নীতিপুলিশগিরি মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই মানুষরা নীতিপুলিশগিরি করতে অপরের শয়নকক্ষে চোখ রাখেন, পার্কে প্রেম করা যুগলদের ধরে অপমান করেন, চুল কেটে ছোট করে দেন, কিভাবে কাপড় পরতে হবে সে বিষয় ছবক দেন! এরাই ঠিক করে দিতে চান কে কার সাথে প্রেম করবে আর কার সাথে করতে পারবে না, কোন সম্প্রদায়ের ছেলের সঙ্গে কোন সম্প্রদায়ের মেয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে! এদের কাছে সমকাম একটা অসুখ! তারা অবশ্য হরহামেশাই একে বাঙালি সংস্কৃতি বলে থাকেন! তাদের নিকট বাঙালি সংস্কৃতি হচ্ছে যৌন বিরোধিতা বা প্রেম বিরোধিতা! তারা একে পাপ বলে ভাবেন এবং অন্যদেরও ভাবতে বলেন!! তারা এসব কাজ গর্বের সাথে করেন এবং নিজেদের বড় দেশপ্রেমিক মনে করেন!!

নীতিপুলিশগিরি মানুষেরা নিজেদের খুব সংস্কৃতিবান মনে করলেও এরাই দেশের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে চলছেন প্রতিনিয়ত। এরা মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলিয়ে তাকে হ্যারেস করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের পিটিয়ে হাতের সুখ করে নেন যাকে তারা দেশপ্রেম বলেন! এটা মোটেই দেশপ্রেম নয়, এটা মস্তানি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এখানে দেশপ্রেম হবে এটাই যে, আমি কোনভাবেই আমার দেশবাসীর ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলাবো না, কাউকে নাক গলাতে দেব না, এমনকি রাষ্ট্রকেও নয়।

নীতিপুলিশগিরি ও দেশপ্রেমকে একে অপরের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। দেশপ্রেম হচ্ছে একজন ব্যক্তি বা একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক মাতৃভূমির প্রতি একধরনের আবেগপূর্ণ অনুরাগ বা ভালোবাসা। আপনি নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবী করলে নিজের কাজটা ভালোভাবে করুন। আপনার বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। পলিথিন বর্জন করুন ও এর ভয়াবহ ক্ষতির বিষয়টি সবাইকে জানান। দেশের বনাঞ্চল ও জলাশয় রক্ষা করুন। বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণসহ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করুন। দুস্থ ও অসহায়দের সেবা করুন। ধর্ষণ, খুন, গুম ও নারীর প্রতি অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে ঠিক রেখে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে কাজ করুন।

বাঙালিদের কাছে গণধোলাইও খুব জনপ্রিয় খেলা হয়ে উঠেছে। ক্রিকেটের মতই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে! অন্য মানুষকে পিটিয়ে চরম সুখ ও আনন্দলাভ করার সুযোগ যেন বাঙালি হাতছাড়া করতেই জানে না। কি ভয়াবহ! সম্প্রতি পদ্মা সেতু ইস্যুতে একটা গুজবকে কেন্দ্র করে যে মানুষগুলোকে পিটিয়ে হত্যা করলো অসভ্য বাঙালিরা তারা অবশ্যই সন্ত্রাসী। এছাড়া চুরির দায়ে, সড়ক দুর্ঘটনার পর এমনকি প্রেম করার জন্যও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে চলছে! এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বন্ধ করার নামই দেশপ্রেম।

এবার আসি দেশপ্রেমের আরেকটি বিষয় নিয়ে! ইদানিং হরহামেশাই দেখা যায় কথায় কথায় পাকিস্তানের সাথে আমাদের দেশকে তুলনা করা। আমরা পাকিস্তানের চেয়ে এই দিকে এগিয়ে আছি, সেইদিকে এগিয়ে আছি! কথায় কথায় গালাগালি আর পাকিস্তানের মেয়েদের ধর্ষণের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারাও এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের মানুষসহ দেশের অসংখ্য পরিবারের মানুষ জীবন দিয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে। স্বাধীনতার অর্জনের জন্য এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে ও দুই লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাকিস্তানি সেনা ও এদেশের পাকি দালালদের হাতে! তাই বলে কি পাকিস্তানি মেয়েদের ধর্ষণ করার মত মানসিকতা গড়ে উঠবে? যে হত্যা-খুন-গুম-ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করলাম সেটাই করতে চাচ্ছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে! কি ভয়াবহ ভাবাই যায় না!

এবার আসি বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে। বাকস্বাধীনতা হচ্ছে স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের; নির্ভয়ে, বিনা প্রহরায় বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যতা ব্যতিরেকে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য অধিকাংশ বাঙালি বাকস্বাধীনতাকে ব্যবহার করে মর্যাদাহানি, কুৎসা রটানো, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা, আক্রমণাত্মক শব্দ, মেধাসম্পদ ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, জননিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বাঙালির বাকস্বাধীনতাই হচ্ছে অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা!! অবশ্য এইক্ষেত্রে অপকার নীতির মাধ্যমে বাকস্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। অপকার নীতির ধারণাটি প্রণয়ন করেছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিল। তিনি তার অন লিবার্টি নামক গ্রন্থে বলেন ‘একটি সভ্য সমাজে কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার উপর তখনই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করা যায়, যখন তা অন্য কোন ব্যক্তির উপর সংঘটিত অপকারকে বাধা দেয়ার জন্য করা হয়।’ অবমাননা নীতির ধারণাও বাকসীমাবদ্ধতার ন্যায্যতা প্রতিপাদনে ব্যবহৃত হয়, এক্ষেত্রে যেসব কথায় সমাজে অবমাননার সৃষ্টি করে সেগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে সবিস্তারে আরেকদিন লেখার ইচ্ছে আছে।

Blog

ডেঙ্গুতে মরছে মানুষ, দায়ী কে?

পৃথিবীতে যেসব প্রাণির কারণে মানুষের প্রাণহানি ঘটে সেসব তার একটি তালিকা এই লেখার সাথে সংযুক্ত করেছি। সেটা পড়ে থাকলে ইতোমধ্যেই জেনেছেন সম্মিলিত গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় মশার কামড়ে প্রতিবছর ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কীটতত্ত্ববীদদের গবেষণায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ৩,৫০০ এর বেশি প্রজাতির মশা সনাক্ত করা গেছে। মশা ক্রেন মাছি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রী মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে থাকে। এদের মধ্যে কিছু মশা রোগজীবাণু সংক্রামক (অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স, এডিস, হেমাগোগাস প্রভৃতি)। এসব মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে।

বর্তমানে পুরো এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি)-প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামে বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- ডব্লিউএইচও জানায়, বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি, অর্থ্যাৎ ২৫০ কোটি মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে।

মশাবাহিত রোগগুলো শত বছর আগে থেকেই ছিলো! কিন্তু এর প্রকোপ কখনোই এত বেশী ছিলনা। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মানুষের প্রকৃতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রাণীকূল বিনষ্ট অন্যতম কারণ বলছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রজননের জন্য মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং ২৭-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশেগুলোতে। সেই উষ্ণতায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডেঙ্গুরবাহক এডিস মশাও। বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে! প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা!

এই যে মশার কারণে এখন এত মানুষ মারা যাচ্ছে এর জন্য দায়ী কিন্তু মানুষই! কারণ মানুষ নিজের জন্য বন কেটে উজার করছে, ফসলের জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করছে, ডিডিটি নামের বিষ ব্যবহার করার ফলে মশা শিকারি ব্যাকটেরিয়া, কীট এবং প্রাণিও কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগে মশার লার্ভার অধিকাংশই ব্যাঙ ও ব্যাঙাচি খেয়ে ফেলত আর এখনতো প্রকৃতিতে আমাদের কারণে এসব প্রাণি বিলীন হয়ে যাচ্ছে! এছাড়া মানুষের কেবল প্লাস্টিকজাত দূষণের কারনেই পৃথিবীতে আর কত প্রজাতির প্রাণি টিকে থাকবে সেটা নিয়েই শংকার শেষ নাই। ইতোমধ্যেই কতশত প্রজাতির প্রাণি হারিয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই।

বাংলাদেশে আবহাওয়ার প্যাটার্নের পরিবর্তনে বাড়ছে ভেক্টরজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে (মশা: ডেঙ্গি, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়াসিস। মাছি: উদরাময়, আমাশয়, ক্রিমি সংক্রমণ, কালাজ্বর, চ্যাগাস ডিজিস, স্লিপিং সিকনেস, চোখের কৃমি)। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনে আরও ভয়াবহ বিপদ আসবে! ভাইরাসগুলো মিউটেশনের মাধ্যমে নিজেদেরকে পরিবর্তন করছে, প্রতিরক্ষা বাড়াচ্ছে, ঔষধের বিরুদ্ধে অপরাজেয় হচ্ছে। তাই এখনই ছোঁয়াচে মহামারী প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়া দরকার।

পৃথিবীর সব প্রাণিই তাদের প্রজাতি রক্ষার জন্য যেখানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। সেখানে মানুষ নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে প্রতিনিয়ত। এইসব বিপদ থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মানুষকে সচেতন ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কোন বিকল্প নেই। মানুষকে অবশ্যই নিজেদের আচরণগত ও ব্যবহারগত পরিবর্তন আনতে হবে। মানুষকে তার নিজের বেঁচে থাকার স্বার্থেই পৃথিবীর সকল প্রাণিকে রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে এমন সকল ধরনের কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখতে যা কিছু করা দরকার করতে হবে। অন্যথায় এই পৃথিবী ধ্বংস হবে আপনার চোখের সামনেই।