Blog

Blog

Blog

প্লাস্টিকে নিমজ্জিত পৃথিবী

বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৩০ কোটি। চলতি বছরের ১৭ জুন ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্ট ২০১৯: হাইলাইটস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানায় আগামী ২০৫০ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হবে। ১৯৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিলো ৩০০ কোটির কাছাকাছি। সেই সময় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে কাগজের ব্যাগসহ নানা ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করত। কিন্তু কাগজের ব্যাগের বিপুল চাহিদা পুরণের জন্য কাটা পড়ত প্রচুর গাছ। পরিবেশ বিপর্যয় এবং স্থলজ বাস্তুসংস্থান এর কথা চিন্তা করে মানুষ কাগজের ব্যাগের বিকল্প নিয়ে কাজ শুরু করে। ১৯৫৯ সালে স্টেইন গুস্তাফ থুলিন নামে এক সুইডিশ প্লাস্টিকের ব্যাগ আবিষ্কার করেন। পরিবেশ বাঁচাতে এবং কাগজের চেয়ে টেকসই এবং পুনঃ পুনঃ ব্যবহারযোগ্য এই ব্যাগ দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তখন অবশ্য মানুষ ভাবেনি মাত্র ৫০ বছর ব্যবধানে এই প্লাস্টিকই হয়ে উঠবে বিশ্বের জন্য সবচেয়ে মরণঘাতী। আজ পুরো পৃথিবীটাই প্লাস্টিকের কারনে নিমজ্জিত হতে চলেছে।

মহাকাশ থেকে শুরু করে যেখানেই মানুষ সেখানেই প্লাস্টিক দূষণ! প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে হচ্ছে শত শত গবেষণা। এসব গবেষণার ফলাফল শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। বলা হচ্ছে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমান বেড়ে যাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই। মানুষ, মাছ, পাখি তথা পৃথিবীর সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, মাটি, বাতাস সবকিছুই প্লাস্টিক দূষণের শিকার।

বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের কয়েকটা গবেষণার ফলাফল আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি-
১. প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে। এখনই এসব পরিযায়ী পাখির প্রায় ৯০% এর পাকস্থলীতেই পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৯% এ, যা এসব পাখির অস্তিত্বের পথে বিরাট বড় এক বাঁধা। এ পাখিরা বাঁচার জন্য সামুদ্রিক প্রাণীদের খেয়ে থাকে। যেহেতু সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ অত্যধিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, তাই সেসব প্লাস্টিক সামুদ্রিক প্রাণী গ্রহণের সাথে সাথে তা পাখির পাকস্থলীতেও চলে যাচ্ছে।

২. প্রতি বছর প্রায় ৮০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী সমুদ্রযানের বর্জ্য পদার্থ দিয়ে আক্রান্ত হয়, আর এসবের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য, যা নিতান্তই আমাদের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

৩. পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রতিবছর প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ গলাধঃকরণ করছে, যে কারণে এদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্লাস্টিকদ্রব্য তাদের প্রজননেও বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এই সামুদ্রিক কচ্ছপগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে।

৪. আমরা যে প্লাস্টিক বোতলগুলো ব্যবহার করে থাকি সেগুলোর মূল উপাদান পলিইথিলিন। এক আউন্স পরিমাণ পলিইথিলিন প্রস্তুত করলেই প্রায় ৫ আউন্স পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুতে নির্গত হয়। এর মানে দাঁড়ায়- আমরা যতটুকু প্লাস্টিকদ্রব্য তৈরি করছি তার থেকে বেশি পরিমাণ দূষিত পদার্থ বায়ুতে নির্গমন করছি।

৫. বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে ৩৩,৮০০টি প্লাস্টিকের বোতল এবং ব্যাগ সাগরে গিয়ে পড়ছে। বছরে যার পরিমাণ ৮০ লাখ টন। ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে গিয়ে মিশবে।

৬. ইউরোপে প্রতিবছর প্রায় আড়াই কোটি টন (২৫ মিলিয়ন টন) প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে অন্তত দেড় লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য মহাদেশের নদ-নদী ও জলাশয়ে গিয়ে জমে।

৭. ফিলিপাইনের অদূরে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম মারিয়ানা ট্রেঞ্চে প্লাস্টিকের ব্যাগের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে

৮. প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বায়ুতাড়িত হয়ে পর্বতচূড়ায় মিলছে। বায়ুদূষণের অন্যতম ক্ষতিকর উপাদান যে ভাসমান বস্তুকণা, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ সে তালিকায় যোগ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

৯. বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকে পড়ছে। ফলে প্লাস্টিকের দূষণ কেবল ঘুরপথে নয়, সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

[আমাদের প্রিয় ঢাকা শহরেই প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্যের মধ্যে ৩০ শতাংশ অপচনশীল। দেশের বর্জ্যের ভাগাড় এবং সড়ক-মহাসড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা আবর্জনার মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিকের আধিক্য দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে অপচনশীল বর্জ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পলিথিন ও প্লাস্টিক]

যাক প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতার মাত্র ০১ ভাগও উপরের আলোচনায় আসেনি। তাহলে বুঝতেই পারছেন কী ভীষণ দূষণের কবলে পড়েছে বিশ্ব!

এবার আসি পলিথিন প্রসঙ্গে! পলিথিন প্লাস্টিকের একটি রুপ। পলিথিন (polythene) হচ্ছে ইথিলিনের পলিমার। এটি অত্যন্ত পরিচিত প্লাষ্টিক। উচ্চ চাপ (১০০০ – ১২০০ atm) ও তাপমাত্রায় (২০০°C) সামান্য অক্সিজেনের উপস্থিতিতে তরলীভূত হয়ে অসংখ্য ইথিলিনের অণু (৬০০-১০০০, মতান্তরে ৪০০-২০০০ অণু) পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হয়ে পলিথিন গঠন করে। পলিথিন নমনীয় কিন্তু শক্ত প্লাস্টিক। এসিড, ক্ষার ও অন্যান্য দ্রাবক দ্বারা আক্রান্ত হয় না। উত্তম তড়িৎ অন্তরক।

আমাদের দৈনদিন্দ কাজে সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করা হয় এই পলিথিন। পলিথিন থেকে বিষ নির্গত হয় এবং খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মিশে যায়। পলিথিন মাটির সঙ্গে মেশে না। ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। ডাস্টবিনে ফেলা পলিথিন বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে ঢুকে পড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পলিথিন নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদী ভরাট করে ফেলে। পলিথিন পোড়ালে তা বায়ুদূষণে সহায়তা করে।

প্লাস্টিক দূষণ কমানোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আরও প্লাস্টিক পুনপ্রস্তু্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিছু কিছু সুপার মার্কেট এ প্লাস্টিক ব্যাগ এর মাধ্যমে আদানপ্রদান কমিয়েছে এবং বায়োডিগ্রেডেবল পদার্থ ব্যবহার করছে। কিন্তু বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক কতখানি পরিবেশবান্ধব সেটাও আলোচনা জরুরী! বায়োডিগ্রেডেবলগুলো হচ্ছে একরকম বায়োপলিমার যাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পোস্টারের মধ্যে পচন ঘটে। গৃহের কম্পোস্টার দ্বারা বায়োডিগ্রেডেবলসমূহের কার্যকরীভাবে পচন ঘটে না, এবং এর ধীর গতির কারণে মিথেন গ্যাস নির্গত হতে পারে। আরেক রকমের ডিগ্রেডেবল বস্তি দেখা যায় যা বায়োপলিমার দ্বারা প্রস্তুত নয়, কারণ এগুলো তেল ভিত্তিক, এবং অন্যান্য চিরাচরিত প্লাস্টিকের মতই আচরণ করে। এই প্লাস্তিকগুলোকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বিভিন্ন এডিটিভের সহায়তায় এগুলোর আরও সহজে ক্ষয় হয়। সূর্যের অতিবেগুণী রশ্মি বা অন্যান্য ভৌত নিয়ামকের সহায়তায় এই এডিটিভগুলো এগুলোর দ্রুত ক্ষয়ে সহায়তা করে। যদিও পলিমারদের এই পচন উন্নীতকারী এডিটিভগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পচন বাড়ায় না বলে দেখা গিয়েছে। বলা যায় বায়োডিগ্রেডেবল ও ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলো প্লাস্টিক দূষণ রোধে সহায়তা করে ঠিকই কিন্তু এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একটি সমস্যা হচ্ছে এরা প্রাকৃতিক পরিবেশে খুব একটা কার্যকরীভাবে ক্ষয় হয় না। তেল ভিত্তিক প্লাস্টিকগুলো একটি ক্ষুদ্রতর অংশে বিভাজিত হয়, কিন্তু এরপরে তারা আর ক্ষয়ীভূত হয় না।

তাহলে কি আবার আমরা কাগজে ফিরে যাবো? সেক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে কাগজের ব্যাগ কী প্লাস্টিক ব্যাগের চেয়ে বেশি পরিবেশ বান্ধব? উত্তর আয়ারল্যান্ডের ২০১১ সালের একটি গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ‘একটি প্লাস্টিক ব্যাগ উৎপাদনের চাইতে অন্তত ৪গুণ বেশী শক্তি প্রয়োজন একটি কাগজের ব্যাগ তৈরিতে।’ এছাড়াও প্লাস্টিক ব্যাগের বিপরীতে কাগজের ব্যাগ তৈরিতে উজাড় হয় বনভূমি। গবেষণাটিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, প্রতি এক একটি প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির তুলনায় কাগজের ব্যাগ উৎপাদনের সময় অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যও তৈরি হয়। এর বাইরে প্লাস্টিকের তুলনায় কাগজের ব্যাগের ওজন বেশী হয়। সুতরাং এটি পরিবহনে প্রয়োজন আরো বেশি শক্তি, ফলে কার্বন উৎসরণের হারও বেশি।

২০০৬ সালে, এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের নিয়ামক খুঁজতে তারা দেখতে চেয়েছিল যে, একটি ব্যাগ কতবার ব্যবহার করা হয়ে থাকে? পরীক্ষায় দেখা যায় যে, কাগজের তৈরি ব্যাগগুলো অন্তত ৩ বার পুন:ব্যবহার করা দরকার, প্লাস্টিকের ব্যাগের তুলনায় তা একবার কম। অন্যপক্ষে দেখা গেছে, কাপড়ের তৈরি ব্যাগ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়, সংখ্যাটি ১৩১। তুলা থেকে সুতা উৎপাদনে যে বিশাল শক্তি ক্ষয় হয় এটি তাকে কিছুটা লাঘব করে।

কিন্তু কাগজের ব্যাগ যদি সবচেয়ে কম বার ব্যবহার উপযোগী হয়, তবে কি এটি সুপারমার্কেটে টিকে থাকবে? বিশেষ করে ভিজে গেলে কাগজের ব্যাগের ব্যবহার উপযোগিতা যেখানে দ্রুত কমে যায়। তাই এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি তাদের গবেষণার উপসংহারে বলছে, কাগজের ব্যাগের টিকে থাকার অযোগ্যতার কারণেই তার পুনঃব্যবহার কম হয়ে থাকে। যদিও প্লাস্টিক ব্যাগের চাইতে কাগজের ব্যাগের পুনঃব্যবহার হার কম, তবুও গবেষকরা এটি ব্যবহারে জোড় দিচ্ছে। তাদের মতে কিভাবে বা কি উপায়ে ব্যাগটি ব্যবহার করা হবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাপড়ে ব্যাগ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশী কার্বন নিঃসরণ সত্ত্বেও এটি সবচেয়ে টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী।

তবে, স্থায়িত্ব সবচেয়ে কম হলেও কাগজের ব্যাগ প্লাস্টিকের তুলনায় প্রকৃতিতে দ্রুত পচনশীল। এছাড়া, কাগজ অনেক বেশী পরিমাণে রিসাইকেল করা হয়ে থাকে। যেখানে প্রকৃতিতে মিশে যেতে একটি প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগের ৪০০ থেকে হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আসলে এই পৃথিবীতে প্রাণীজগৎ সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রকৃতির তৈরি জিনিসই ব্যবহার করতে হবে এবং অবশ্যই প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে। অর্থাৎ কেটে ফেলা গাছগুলির পরিবর্তে যদি দ্রুত নতুন বনায়ন করা সম্ভব হয় তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বন্ধ করতে সহায়তা করবে, কেননা গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শুষে নেয়। বিশ্বব্যাপী আইন করা উচিৎ যে, ‘মানুষ তার প্রয়োজেন গাছ তখনই কর্তণ করবে যখন কর্তণকৃত গাছের সংখ্যার ১০ গুন গাছ প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া নিশ্চিৎ করবে’।

প্লাস্টিকের ভয়াল গ্রাস থেকে পৃথিবীকে তথা আমাদের নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এখনি প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার বিকল্প নেই।

প্লাস্টিকের দূষণরোধে আমাদের করণীয়-
১) প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ বর্জন করা।
২) আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার সীমিত করা।
৩) পাটজাত দ্রব্যের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে পাটশিল্পকে পুনরায় জাগিয়ে তোলা। প্রকৃতিকে তার মত রেখেই সব জায়গায় প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটজাত পণ্যের মত অন্যান্য প্রাকৃতিক পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
৪) জনগণকে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তোলা।
৫) পনিরবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের কারণে সরকারিভাবে ভোক্তা এবং উদ্যোক্তাদের পুরষ্কৃত করে তাদেরকে এসবের ব্যবহারে আরো উৎসাহিত করা।
৬) যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে পর্যাপ্ত শাস্তি এবং জরিমানার ব্যবস্থা করা।
৭) প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের উপর অত্যাধিক শুল্কারোপ করা। পাটজাত পদার্থের মূল্য কমিয়ে পাটজাত পণ্যকে আরো সহজলভ্য করে তোলা।

তথ্যসূত্র
১. বিবিসি
২. রয়টার্স
৩. উইকিপিডিয়া
৪. ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি
৫. জাগরণীয়া
৬. গো-ইকো
৭. জার্নাল অফ এনভারোনমেন্ট সাইন্স
৮. রিসার্চগেট
৯. প্লাস্টিকওশেন

ছবি: বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও রিসার্চ জার্ণাল থেকে সংগ্রহ

Blog

নীতিপুলিশগিরি ও দেশপ্রেম!

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় ঢুঁ মারলেই দেখা যায় নীতিপুলিশগিরি মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই মানুষরা নীতিপুলিশগিরি করতে অপরের শয়নকক্ষে চোখ রাখেন, পার্কে প্রেম করা যুগলদের ধরে অপমান করেন, চুল কেটে ছোট করে দেন, কিভাবে কাপড় পরতে হবে সে বিষয় ছবক দেন! এরাই ঠিক করে দিতে চান কে কার সাথে প্রেম করবে আর কার সাথে করতে পারবে না, কোন সম্প্রদায়ের ছেলের সঙ্গে কোন সম্প্রদায়ের মেয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে! এদের কাছে সমকাম একটা অসুখ! তারা অবশ্য হরহামেশাই একে বাঙালি সংস্কৃতি বলে থাকেন! তাদের নিকট বাঙালি সংস্কৃতি হচ্ছে যৌন বিরোধিতা বা প্রেম বিরোধিতা! তারা একে পাপ বলে ভাবেন এবং অন্যদেরও ভাবতে বলেন!! তারা এসব কাজ গর্বের সাথে করেন এবং নিজেদের বড় দেশপ্রেমিক মনে করেন!!

নীতিপুলিশগিরি মানুষেরা নিজেদের খুব সংস্কৃতিবান মনে করলেও এরাই দেশের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে চলছেন প্রতিনিয়ত। এরা মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলিয়ে তাকে হ্যারেস করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের পিটিয়ে হাতের সুখ করে নেন যাকে তারা দেশপ্রেম বলেন! এটা মোটেই দেশপ্রেম নয়, এটা মস্তানি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এখানে দেশপ্রেম হবে এটাই যে, আমি কোনভাবেই আমার দেশবাসীর ব্যক্তিগত পরিসরে নাক গলাবো না, কাউকে নাক গলাতে দেব না, এমনকি রাষ্ট্রকেও নয়।

নীতিপুলিশগিরি ও দেশপ্রেমকে একে অপরের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। দেশপ্রেম হচ্ছে একজন ব্যক্তি বা একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক মাতৃভূমির প্রতি একধরনের আবেগপূর্ণ অনুরাগ বা ভালোবাসা। আপনি নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবী করলে নিজের কাজটা ভালোভাবে করুন। আপনার বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। পলিথিন বর্জন করুন ও এর ভয়াবহ ক্ষতির বিষয়টি সবাইকে জানান। দেশের বনাঞ্চল ও জলাশয় রক্ষা করুন। বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণসহ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করুন। দুস্থ ও অসহায়দের সেবা করুন। ধর্ষণ, খুন, গুম ও নারীর প্রতি অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে ঠিক রেখে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে কাজ করুন।

বাঙালিদের কাছে গণধোলাইও খুব জনপ্রিয় খেলা হয়ে উঠেছে। ক্রিকেটের মতই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে! অন্য মানুষকে পিটিয়ে চরম সুখ ও আনন্দলাভ করার সুযোগ যেন বাঙালি হাতছাড়া করতেই জানে না। কি ভয়াবহ! সম্প্রতি পদ্মা সেতু ইস্যুতে একটা গুজবকে কেন্দ্র করে যে মানুষগুলোকে পিটিয়ে হত্যা করলো অসভ্য বাঙালিরা তারা অবশ্যই সন্ত্রাসী। এছাড়া চুরির দায়ে, সড়ক দুর্ঘটনার পর এমনকি প্রেম করার জন্যও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে চলছে! এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বন্ধ করার নামই দেশপ্রেম।

এবার আসি দেশপ্রেমের আরেকটি বিষয় নিয়ে! ইদানিং হরহামেশাই দেখা যায় কথায় কথায় পাকিস্তানের সাথে আমাদের দেশকে তুলনা করা। আমরা পাকিস্তানের চেয়ে এই দিকে এগিয়ে আছি, সেইদিকে এগিয়ে আছি! কথায় কথায় গালাগালি আর পাকিস্তানের মেয়েদের ধর্ষণের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারাও এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের মানুষসহ দেশের অসংখ্য পরিবারের মানুষ জীবন দিয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে। স্বাধীনতার অর্জনের জন্য এদেশের ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে ও দুই লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাকিস্তানি সেনা ও এদেশের পাকি দালালদের হাতে! তাই বলে কি পাকিস্তানি মেয়েদের ধর্ষণ করার মত মানসিকতা গড়ে উঠবে? যে হত্যা-খুন-গুম-ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করলাম সেটাই করতে চাচ্ছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে! কি ভয়াবহ ভাবাই যায় না!

এবার আসি বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে। বাকস্বাধীনতা হচ্ছে স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের; নির্ভয়ে, বিনা প্রহরায় বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যতা ব্যতিরেকে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য অধিকাংশ বাঙালি বাকস্বাধীনতাকে ব্যবহার করে মর্যাদাহানি, কুৎসা রটানো, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা, আক্রমণাত্মক শব্দ, মেধাসম্পদ ও বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, জননিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বাঙালির বাকস্বাধীনতাই হচ্ছে অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা!! অবশ্য এইক্ষেত্রে অপকার নীতির মাধ্যমে বাকস্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। অপকার নীতির ধারণাটি প্রণয়ন করেছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিল। তিনি তার অন লিবার্টি নামক গ্রন্থে বলেন ‘একটি সভ্য সমাজে কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার উপর তখনই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করা যায়, যখন তা অন্য কোন ব্যক্তির উপর সংঘটিত অপকারকে বাধা দেয়ার জন্য করা হয়।’ অবমাননা নীতির ধারণাও বাকসীমাবদ্ধতার ন্যায্যতা প্রতিপাদনে ব্যবহৃত হয়, এক্ষেত্রে যেসব কথায় সমাজে অবমাননার সৃষ্টি করে সেগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে সবিস্তারে আরেকদিন লেখার ইচ্ছে আছে।

Blog

ডেঙ্গুতে মরছে মানুষ, দায়ী কে?

পৃথিবীতে যেসব প্রাণির কারণে মানুষের প্রাণহানি ঘটে সেসব তার একটি তালিকা এই লেখার সাথে সংযুক্ত করেছি। সেটা পড়ে থাকলে ইতোমধ্যেই জেনেছেন সম্মিলিত গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় মশার কামড়ে প্রতিবছর ১০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কীটতত্ত্ববীদদের গবেষণায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ৩,৫০০ এর বেশি প্রজাতির মশা সনাক্ত করা গেছে। মশা ক্রেন মাছি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রী মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে থাকে। এদের মধ্যে কিছু মশা রোগজীবাণু সংক্রামক (অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স, এডিস, হেমাগোগাস প্রভৃতি)। এসব মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে।

বর্তমানে পুরো এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি)-প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামে বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- ডব্লিউএইচও জানায়, বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি, অর্থ্যাৎ ২৫০ কোটি মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে।

মশাবাহিত রোগগুলো শত বছর আগে থেকেই ছিলো! কিন্তু এর প্রকোপ কখনোই এত বেশী ছিলনা। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মানুষের প্রকৃতি বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রাণীকূল বিনষ্ট অন্যতম কারণ বলছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রজননের জন্য মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং ২৭-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশেগুলোতে। সেই উষ্ণতায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডেঙ্গুরবাহক এডিস মশাও। বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে! প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা!

এই যে মশার কারণে এখন এত মানুষ মারা যাচ্ছে এর জন্য দায়ী কিন্তু মানুষই! কারণ মানুষ নিজের জন্য বন কেটে উজার করছে, ফসলের জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করছে, ডিডিটি নামের বিষ ব্যবহার করার ফলে মশা শিকারি ব্যাকটেরিয়া, কীট এবং প্রাণিও কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগে মশার লার্ভার অধিকাংশই ব্যাঙ ও ব্যাঙাচি খেয়ে ফেলত আর এখনতো প্রকৃতিতে আমাদের কারণে এসব প্রাণি বিলীন হয়ে যাচ্ছে! এছাড়া মানুষের কেবল প্লাস্টিকজাত দূষণের কারনেই পৃথিবীতে আর কত প্রজাতির প্রাণি টিকে থাকবে সেটা নিয়েই শংকার শেষ নাই। ইতোমধ্যেই কতশত প্রজাতির প্রাণি হারিয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই।

বাংলাদেশে আবহাওয়ার প্যাটার্নের পরিবর্তনে বাড়ছে ভেক্টরজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে (মশা: ডেঙ্গি, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়াসিস। মাছি: উদরাময়, আমাশয়, ক্রিমি সংক্রমণ, কালাজ্বর, চ্যাগাস ডিজিস, স্লিপিং সিকনেস, চোখের কৃমি)। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনে আরও ভয়াবহ বিপদ আসবে! ভাইরাসগুলো মিউটেশনের মাধ্যমে নিজেদেরকে পরিবর্তন করছে, প্রতিরক্ষা বাড়াচ্ছে, ঔষধের বিরুদ্ধে অপরাজেয় হচ্ছে। তাই এখনই ছোঁয়াচে মহামারী প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়া দরকার।

পৃথিবীর সব প্রাণিই তাদের প্রজাতি রক্ষার জন্য যেখানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। সেখানে মানুষ নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে প্রতিনিয়ত। এইসব বিপদ থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মানুষকে সচেতন ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কোন বিকল্প নেই। মানুষকে অবশ্যই নিজেদের আচরণগত ও ব্যবহারগত পরিবর্তন আনতে হবে। মানুষকে তার নিজের বেঁচে থাকার স্বার্থেই পৃথিবীর সকল প্রাণিকে রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে এমন সকল ধরনের কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখতে যা কিছু করা দরকার করতে হবে। অন্যথায় এই পৃথিবী ধ্বংস হবে আপনার চোখের সামনেই।